বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৪, ১২ বৈশাখ ১৪৩১

আভিজাত্য ও আথিতেয়তা 

জীবন যাপন | ড. মুহম্মদ মফিজুর রহমান আগস্ট ২, ২০২৩, ০৭:২৭ পিএম
আভিজাত্য ও আথিতেয়তা 
ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত

ছোটবেলায় দেখতাম - আজ এক আত্মীয় আসছেন তো কাল আরেক আত্মীয়।কেউ আসতেন পুরা পরিবার। আমার খুলনার খালা আসতেন বাস নিয়ে। তাঁর পরিবারের সদস্যদের জন্য একটা মিনি বাস তখন লাগতো। এখন হয়ত লাগবে ঢাকার ডাবল ডেকার! 

কি যে হৈচৈ করতাম! মেলার সময়ে ছিলো আরো হুলুস্থুল। মামা মেলায় নিয়ে যেতেন মাথা গুণে। কিছুক্ষণ পরপর মাথা গুণতেন -সংখ্যা ঠিক রাখতে! মামাতো খালাতো ভাইবোন যা ছিলাম - তা নিয়ে মামার মেলায় মুভ করা কঠিন ছিলো, তাই বুদ্ধি করে তিনি ২/৩ গ্রুপে ভাগ করতেন। গিয়েই মিষ্টির দোকানীর পিছনের দিকে নিয়ে খোলা যায়গায় ১/২ গ্রুপকে ডিপো করতেন। আর দোকানীকে বলতেন - এরা যা যা খায়, যতটুকু খায় দিতে থাকবেন। আর তিনি এক গ্রুপ নিয়ে মেলার ভিতর যেতেন খেলনা/চুড়ি কিনে দিতে। কিছুক্ষণ পরে এসে গ্রুপ চেঞ্জ করে নিতে যেতেন। সবার খাওয়া আর খেলনা পাতি কেনার পরে যখন বাড়ীর দিকে রওয়ানা দিতাম - সে আরেক কান্ড! রসগোল্লার রসে জামা ভিজছে অনেকেরই! প্যাঁ পুঁ কেউ বাঁশি বাজাই, কেউ বা লটর পটর শব্দে হেলিকপ্টার ঠেলি, কেউ ঘ্যারাত ঘ্যারাত শব্দের ল্যাটার সুতা হাতে ঘুরাই - সে কী হুলুস্থুল। সবচেয়ে বড় দুয়েকজনের হাতে রং করা মাটির হাড়িতে সাঁজ বাতাশা সুতায় ঝুলানো। এর মধ্যে হাঁটতে গিয়ে ছোট কেউ পড়ে গিয়ে ভ্যাঁ করে কান্নাকাটি! সব মিলে এক মহানন্দ!!

বাড়ীতে যখন আত্মীয়স্বজন আসতেন তখন লেখাপড়ার কোনো বালাই ছিলো না - সেজন্য আত্মীয়দের জন্য দোওয়া করতাম। তাঁরা যেনো ঘন ঘন আসেন। আত্মীয়দের আসাও খুব সহজ ছিলো। প্রায় খালি হাতেই, না বলে এসে উঠতেন। এদিকে বাড়ীর লোকেরাও গ্রামের কলাই শাক, পুকুরের মাছ, চালের পিঠা, কচুর ফুল যা খেতে দিতেন আত্মীয়রা তা মহানন্দে খেতেন। আখের ক্ষেত হতে আখ কেটে গাইট বেঁধে এনে উঠোনে বসে গালে মাড়াই করতেন। সেই আখের রসের প্রতিটি ফোটায় ছিলো সুখ। এভাবে দুই চার দিন পার হয়ে যেতো নিমিষেই। 

এখন দিন বদলেছে। আত্মীয়ের সময় নেই বেড়াতে যাওয়ার। তারমধ্যে না বলে কারোর বাড়ীতে উঠে পড়া আরেক অভদ্রতা। তারমধ্যে সবচেয়ে জটিল হচ্ছে -কী নিয়ে বেড়াতে এসেছেন! কতটুকু এনেছেন! কোন মানের দোকান হতে এনেছেন! আবার যার বাড়ীতে এসেছেন - তিনি কী খাওয়াইলেন!

কিভাবে খাওয়াইলেন! খাবার সরবরাহের সময় মুখের হাসি কেমন ছিলো -তাও গণনাযোগ্য! খাবারের মেন্যুতে এখন আর কচুঁর ফুল চলে না। পোলাও, রোস্ট, বিফ, কাবাব ইত্যাদি না খাওয়ালে আত্মীয়কে অসম্মান করা হয়। অন্যদিকে আত্মীয়েরও সাথে থাকবে দুইহাত ভরা উপঢৌকন। উভয় পক্ষেরই বিরাট খরচের বহর। 

তাইতো এখন আর কেউ হঠাৎ করে আত্মীয়ের বাড়ীতে বেড়াতে যান না। ফোনে কাজ সারতে পারলে না গিয়েই ভালো। কমে যাচ্ছে সম্পর্কের বন্ধন। পাতলা হচ্ছে রক্তের ঘনত্ব। 
লুপ্ত হচ্ছে আতিথেয়তা,  দৃঢ় হচ্ছে আভিজাত্য।

ড. মুহম্মদ মফিজুর রহমান
বিসিএস, সাধারণ শিক্ষা;
পিএইচডি, হুয়াজং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, চীন

Side banner